০৯:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষঃ
অর্থনীতির গতি ফিরাতে রোডশো — বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গ্রিন কনসার্নসের উদ্যোগে তেজগাঁওয়ে রোড ডিভাইডারে বৃক্ষরোপণ দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মায় পড়ল — হতাহতের খবর নেই শহীদ জিয়ার সার্ক-ভিত্তিক বহুপাক্ষিক কূটনীতি সরকারের মূল পথ: তথ্যমন্ত্রী দৌলতদিয়ায় ফেরিঘাটে যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মায় পড়ে গেছে বিইআরসি প্রত্যাহার করল ০–৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বকীয়তার প্রতীক: মির্জা ফখরুল বিআইডব্লিউটিএ’র নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করলেন মোঃ মুহিদুল ইসলাম মো. মুহিদুল ইসলাম বিআইডব্লিউটিএ’র নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান বাজেট ও সংস্কারে স্বাস্থ্যখাত: পরিবর্তনের পথে

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিদ্যুৎ–জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি: নতুন বাজেটের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

দীর্ঘ সময় ধরে বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও তীব্র করেছে। এমন সংকটাপন্ন সময়ে সরকার ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট হওয়ায় প্রত্যাশা অনেক, কিন্তু বাস্তবতা বেশ জটিল ও চ্যালেঞ্জিং। অর্থনীতিবিদরা বলছেন—লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বহুমাত্রিক ঋণ শোধের চাপ সামলানো এবং মন্থর অর্থনীতিতে পুনরায় গতি আনা এবারের বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় বাধা হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্যও সংকটের তীব্রতা ফুটিয়ে তোলে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মার্চে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৭১ শতাংশ, অথচ এক মাসের মধ্যে এপ্রিলে তা বেড়ে ৯.০৪ শতাংশে ওঠে। সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার, কিন্তু বর্তমান গতিপথে সেটা অর্জন করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ওঠা-নেমা, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত এবং টাকার প্রতি ডলারের অবমূল্যায়ন—এসব মিলিয়ে আমদানির খরচ বহুগুণ বেড়েছে এবং তা সরাসরি স্থানীয় বাজারে দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দেখাচ্ছেন যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানো কেবল নির্দিষ্ট কোনো খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সমগ্র অর্থনীতিতে ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ সৃষ্টি করে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের খরচ বাড়লে কৃষি উৎপাদন, শিল্পকারখানা, পরিবহন ব্যবস্থা, পণ্য সরবরাহ ও সেবা খাত—সবখানেই উৎপাদন ও সরবরাহ খরচ বাড়ে। উৎপাদকরা এবং ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত ব্যয় ভোগ করতে গিয়ে সেটি শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেন, ফলে প্রতিটি পণ্যের চাহিদা ও ক্রয়ক্ষমতা ক্ষতি হয়। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাদের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হচ্ছে।

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদনসামর্থ্য এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকতে সমস্যার কারণ হতে পারে। উৎপাদন ব্যয়ের বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় কাঁচামাল থেকে রপ্তানি পর্যায়েও শিল্পীরা পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখাচ্ছেন। পরিবহণ খাতের ব্যয় বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খলে অনিশ্চয়তা বাড়ে। সেচ ও কৃষিসামগ্রীর জন্য ব্যবহৃত জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, যা পরোক্ষভাবে খাদ্য নিরাপত্তার ওপর হুমকি তৈরি করতে পারে। সব মিলিয়ে দেশের প্রবৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যও ব্যাহত হতে পারে।

বাজেট ঘোষণা করতে যাওয়ার আগে সরকারকে অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে—উন্নয়ন অর্জন ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য স্থাপন করতে হবে। নীতিনির্ধারকদের জন্য কঠিন সিদ্ধান্তের সময় এলো: কোথায় ব্যয় বৃদ্ধি করা হবে, কোথায় ছাঁটাই প্রয়োজন, এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, কার্যকর কৃচ্ছ্রসংক্রান্ত ব্যবস্থা, রাজস্ব সংগ্রহের সুশৃঙ্খল নীতি ও দক্ষ লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তা ছাড়া এই সংকট থেকে বেরোবার পথ কঠিন। আসন্ন বাজেটে যদি টেকসই রাজস্ব সংস্কার, সুনির্দিষ্ট গৃহীত সহায়তা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে কার্যকর নিষ্পত্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিকল্পনা থাকে—তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যেতে পারে। নীতির বাস্তবায়নই শেষপর্যন্ত নির্ধারণ করবে নতুন বাজেট সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কি ধরনের স্বস্তি বা চাপ আনতে পারবে।

ট্যাগ :
সর্বাধিক পঠিত

গ্রিন কনসার্নসের উদ্যোগে তেজগাঁওয়ে রোড ডিভাইডারে বৃক্ষরোপণ

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিদ্যুৎ–জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি: নতুন বাজেটের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

প্রকাশিতঃ ০৭:২৩:৫৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬

দীর্ঘ সময় ধরে বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও তীব্র করেছে। এমন সংকটাপন্ন সময়ে সরকার ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট হওয়ায় প্রত্যাশা অনেক, কিন্তু বাস্তবতা বেশ জটিল ও চ্যালেঞ্জিং। অর্থনীতিবিদরা বলছেন—লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বহুমাত্রিক ঋণ শোধের চাপ সামলানো এবং মন্থর অর্থনীতিতে পুনরায় গতি আনা এবারের বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় বাধা হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্যও সংকটের তীব্রতা ফুটিয়ে তোলে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মার্চে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৭১ শতাংশ, অথচ এক মাসের মধ্যে এপ্রিলে তা বেড়ে ৯.০৪ শতাংশে ওঠে। সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার, কিন্তু বর্তমান গতিপথে সেটা অর্জন করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ওঠা-নেমা, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত এবং টাকার প্রতি ডলারের অবমূল্যায়ন—এসব মিলিয়ে আমদানির খরচ বহুগুণ বেড়েছে এবং তা সরাসরি স্থানীয় বাজারে দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দেখাচ্ছেন যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানো কেবল নির্দিষ্ট কোনো খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সমগ্র অর্থনীতিতে ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ সৃষ্টি করে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের খরচ বাড়লে কৃষি উৎপাদন, শিল্পকারখানা, পরিবহন ব্যবস্থা, পণ্য সরবরাহ ও সেবা খাত—সবখানেই উৎপাদন ও সরবরাহ খরচ বাড়ে। উৎপাদকরা এবং ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত ব্যয় ভোগ করতে গিয়ে সেটি শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেন, ফলে প্রতিটি পণ্যের চাহিদা ও ক্রয়ক্ষমতা ক্ষতি হয়। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাদের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হচ্ছে।

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদনসামর্থ্য এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকতে সমস্যার কারণ হতে পারে। উৎপাদন ব্যয়ের বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় কাঁচামাল থেকে রপ্তানি পর্যায়েও শিল্পীরা পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখাচ্ছেন। পরিবহণ খাতের ব্যয় বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খলে অনিশ্চয়তা বাড়ে। সেচ ও কৃষিসামগ্রীর জন্য ব্যবহৃত জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, যা পরোক্ষভাবে খাদ্য নিরাপত্তার ওপর হুমকি তৈরি করতে পারে। সব মিলিয়ে দেশের প্রবৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যও ব্যাহত হতে পারে।

বাজেট ঘোষণা করতে যাওয়ার আগে সরকারকে অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে—উন্নয়ন অর্জন ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য স্থাপন করতে হবে। নীতিনির্ধারকদের জন্য কঠিন সিদ্ধান্তের সময় এলো: কোথায় ব্যয় বৃদ্ধি করা হবে, কোথায় ছাঁটাই প্রয়োজন, এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, কার্যকর কৃচ্ছ্রসংক্রান্ত ব্যবস্থা, রাজস্ব সংগ্রহের সুশৃঙ্খল নীতি ও দক্ষ লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তা ছাড়া এই সংকট থেকে বেরোবার পথ কঠিন। আসন্ন বাজেটে যদি টেকসই রাজস্ব সংস্কার, সুনির্দিষ্ট গৃহীত সহায়তা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে কার্যকর নিষ্পত্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিকল্পনা থাকে—তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যেতে পারে। নীতির বাস্তবায়নই শেষপর্যন্ত নির্ধারণ করবে নতুন বাজেট সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কি ধরনের স্বস্তি বা চাপ আনতে পারবে।