মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত স্থিতির কারণে পারস্য উপসাগরে এক বিশাল মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। সামরিক ও কূটনৈতিক কোণঠাসা অবস্থার ফলে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে—সেখানে বর্তমানে অন্তত ২ হাজার ১৯০টি বাণিজ্যিক জাহাজ আটকা পড়ে রয়েছে এবং বিপুল সংখ্যক নাবিক অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছেন।
সামুদ্রিক তথ্যভাণ্ডারগুলো বিভিন্ন অংকে তথ্য দিচ্ছে; এক সূত্রে বলা হয়েছে আটকে থাকা জাহাজগুলোর মধ্যে প্রায় ৩২০টি তেল ও গ্যাস ট্যাঙ্কার রয়েছে। সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা কেপলারের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই তালিকার মধ্যে ৫০টি বড় অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাঙ্কার এবং ১২টি বড় এলএনজি পরিবাহী জাহাজ রয়েছে।
সাধারণত এই জ্বলন্ত জলপথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২০টি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। কিন্তু সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ছয়টি জাহাজই প্রণালি পার হতে সক্ষম হয়েছে—অর্থাৎ তাত্ত্বিকভাবে এই রুটটি কার্যত অবরুদ্ধ।
ইরানের একক নিয়ন্ত্রণের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল। তেহরান লারাক দ্বীপের পাশ দিয়েই একটি অত্যন্ত সংকীর্ণ করিডোর খুলে সীমিত সংখ্যক জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে। কিন্তু ওই করিডোর ব্যবহার করতে হচ্ছে বিপুল জরিমানা—প্রতিটি জাহাজকে প্রায় ২০ লাখ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক ২৪ কোটি টাকা) পর্যন্ত ফি দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জাহাজ সংস্থার চালকরা এই চর্চাকে কটাক্ষ করে ‘তেহরান টোল বুথ’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
এই নিষেধাজ্ঞা ও অতিরিক্ত ফি কেবল অর্থনৈতিক নয়—মানবিক সংকটও তীব্র। সমুদ্রপথে আটকে থাকা প্রায় ২০ হাজার নাবিক খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য জরুরি সুরাহার অনিশ্চয়তার মুখে দিন কাটাচ্ছেন। মাইন প্রতিস্থাপন, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় অনেক জাহাজ রাতে তাদের ট্র্যাকিং সিস্টেম বন্ধ করে গোপনে চলাচল করার চেষ্টা করছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় আটকে থাকার কারণে নাবিকদের মানসিক অবস্থা ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কেও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও শুরু হয়েছে। যুক্তরাজ্য ৩৫টি দেশের প্রতিনিধিকে নিয়ে একটি জরুরি বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছে। চীন ও পাকিস্তান যৌথভাবে সরাসরি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য নিরাপদ করিডোর নিশ্চিত করার দাবি তুলেছে। একই সঙ্গে চীন জানিয়েছে কূটনৈতিক সমন্বয়ের মাধ্যমে তাদের অন্তত তিনটি বড় কন্টেইনার জাহাজ দ্রুত হরমুজ প্রণালি পার হতে পেরেছে। মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পেট্রোনাসের কিছু জাহাজও ছাড়পত্রের অপেক্ষায় লারাক দ্বীপের কাছে অবস্থিত; তেহরান কিছু দেশকে বিশেষ ছাড়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, একটি গ্রিক জাহাজ সৌদি তেল নিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে চলাচল করেছে এবং ভারতের কয়েকটি এলপিজি জাহাজও ঝুঁকি নিয়ে এই রুট অতিক্রম করেছে।
অবশেষে রাজনৈতিক ভাষ্যকেও তীব্র করা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন—তেহরান যদি অবিলম্বে প্রণালি উন্মুক্ত না করে, তাহলে কঠোর সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হতে পারে, এমন শব্দও তিনি ব্যবহার করেছেন।
হরমুজ প্রণালির এই অচলাবস্থা এখন বিশ্ব বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় রকমের ধাক্কা পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং পরিস্থিতি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে জরুরি কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করে নিরাপদ নৌপথ ফিরিয়ে আনা এবং আটকে থাকা নাবিকদের মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 






















