০৫:২৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষঃ
সৌদি আরব বাংলাদেশে পরিবহন, লজিস্টিকস ও সামুদ্রিক খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান: শিশুদের মানবিকভাবে গড়ুন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় পরিচ্ছন্ন, পরিকল্পিত নগর গড়তে কাজ করছে সরকার: স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মানব পাচার ও প্রযুক্তি অপব্যবহার রোধে নতুন আইন কার্যকর হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কাতারের সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির প্রয়াণে আজ বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় শোক এলডিসিদের টেকসই উত্তরণে বৈশ্বিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান প্রধানমন্ত্রী ঘোষনা: স্টার্টআপে ৫ লাখ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন এলডিসির টেকসই উত্তরণে বৈশ্বিক সহায়তা বাড়ানোর দাবি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ মডেল মসজিদ প্রকল্পে দুর্নীতি ‘গর্হিত ও ন্যক্কারজনক’: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

দেশের জীববৈচিত্রের জন্য হুমকি ৬৯টি বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতি

দেশে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করছে বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতির প্রবেশ। এই প্রজাতিগুলোর মধ্যে উদ্ভিদ, মাছ, পাখি, কীটপতঙ্গ ও অন্যান্য প্রাণী অন্তর্ভুক্ত, যা একসময়ই দেশের স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য অস্বাভাবিক চাপ তৈরি করে দিচ্ছে। শেষ তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৬৯টি বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে, এর মধ্যে রয়েছে ৪৬টি উদ্ভিদ, ১৬টি মাছ, ৫টি কীটপতঙ্গ এবং শামুক ও পাখিসহ অন্যান্য প্রাণী। এসব প্রজাতির বেশির ভাগই এসেছে দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া থেকে। বিজ্ঞানীদের মতে, ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে, ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ভুলে বা দুর্ঘটনাবশত এই প্রজাতিগুলো বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এর ফলে দেশীয় প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকালেই রাজধানীর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘জার্নালিস্ট ওরিয়েন্টেশন ওয়ার্কশপ অন পেস্টিসাইড রিস্ক রিডাকশন’ কর্মশালায় এই তথ্য উপস্থাপন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মহাপরিচালক মো. ছাইফুল আলম, আর সভাপতিত্ব করেন ডিএই এর সাবেক মহাপরিচালক আব্দুল মুঈদ। উপস্থিত ছিলেন কেবির এশিয়া অঞ্চলের ডেভেলপমেন্ট কমিউনিকেশন ম্যানেজার আজমত আব্বাস, বাংলাদেশ কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ ড. সালেহ আহমেদ ও প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর ড. দিলরুবা শারমিনসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্থেনিয়াম (Parthenium hysterophorus) নামক আগাছা বাংলাদেশে নতুন হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এই উদ্ভিদ, যা মাঠ, রাস্তার ধারে ও পতিত জমিতে অপ্রতিরোধ্যভাবে বিস্তার লাভ করছে। পাশাপাশি বিদেশি আগ্রাসী মাছগুলোও স্থানীয় প্রজাতির মাছের জন্য বড় বিপদ হয়ে উঠেছে। এরা প্রাকৃতিক মাছের উৎপাদন কমিয়ে দেয়া ছাড়াও কৃষিজমির উর্বরতাও ক্ষতিগ্রস্ত করছে, ফলে কৃষকদের জন্য বড় ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, পার্থেনিয়াম কৃষিজমির উর্বরতা কমিয়ে দেয় এবং ধান, গম, ভুট্টা, সবজি ও ডালশস্যের উৎপাদন হ্রাস করে। এর ফলে কৃষকরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। এছাড়া, এই আগাছা মাটির গুণাগুণ বদলে দেয়, যা স্থানীয় গাছপালা ও উদ্ভিদ প্রজাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক। মানুষের জন্যও এটি ক্ষতিকর, কারণ এর থেকে নির্গত রাসায়নিক উপাদান ত্বক, শ্বাসতন্ত্রে অ্যালার্জি, হাঁপানি, চোখে প্রদাহের মতো রোগ সৃষ্টি করে। পশুপালকরা যদি এই আগাছা খায়, তবে তাদের গবাদিপশুর দুধের মান কমে যায় এবং উৎপাদন ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দেয়।

অন্যদিকে, ১৯৮০-এর দশকে মাছ চাষের জন্য আফ্রিকান ক্যাটফিশ (Clarias gariepinus) বাংলাদেশে আনা হয়, যা স্থানীয় মাছের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। যদিও ২০১৪ সালে এর চাষ ও বিক্রি নিষিদ্ধ করা হলেও এখনও অবৈধভাবে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এটি দেশীয় ছোট মাছগুলোকে ব্যাপকভাবে দমন করছে এবং ভবিষ্যতে জিনগত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তেমনি পিরানহা বা সাকারমাউথ ক্যাটফিশ (Hypostomus plecostomus) হিসেবে পরিচিত এই মাছগুলোও দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। মূলত অ্যাকুয়ারিয়ামের মাছ হলেও এখন নদী-নালায় বিচরণ করছে। দূষিত জলও এদের বেঁচে থাকার জন্য উপযুক্ত, আর এই মাছগুলো দেশীয় মাছের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে এবং নদীর তলদেশে গর্ত করে নদীর উপকূল ও পরিবেশ নষ্ট করছে।

এছাড়া, বিদেশি কার্প মাছ যেমন বিগহেড, সিলভার, ও কমন কার্প প্রাকৃতিক জলাশয়ে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেছে। এই প্রজাতিগুলো দেশীয় মাছের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে টিকে থাকতে চায়, যা দেশের মাছের বৈচিত্র্য ও প্রজনন প্রক্রিয়াকে হুমকিতে ফেলেছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন, এসব বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতির প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে, বাংলাদেশের স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ চরম ঝুঁকিতে পড়বে। তাই এখনই প্রয়োজন উদ্ভিদ, মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর বৈধ প্রবেশের কঠোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণের।

ট্যাগ :
সর্বাধিক পঠিত

প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান: শিশুদের মানবিকভাবে গড়ুন

দেশের জীববৈচিত্রের জন্য হুমকি ৬৯টি বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতি

প্রকাশিতঃ ১০:৫০:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫

দেশে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করছে বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতির প্রবেশ। এই প্রজাতিগুলোর মধ্যে উদ্ভিদ, মাছ, পাখি, কীটপতঙ্গ ও অন্যান্য প্রাণী অন্তর্ভুক্ত, যা একসময়ই দেশের স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য অস্বাভাবিক চাপ তৈরি করে দিচ্ছে। শেষ তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৬৯টি বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে, এর মধ্যে রয়েছে ৪৬টি উদ্ভিদ, ১৬টি মাছ, ৫টি কীটপতঙ্গ এবং শামুক ও পাখিসহ অন্যান্য প্রাণী। এসব প্রজাতির বেশির ভাগই এসেছে দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া থেকে। বিজ্ঞানীদের মতে, ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে, ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ভুলে বা দুর্ঘটনাবশত এই প্রজাতিগুলো বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এর ফলে দেশীয় প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকালেই রাজধানীর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘জার্নালিস্ট ওরিয়েন্টেশন ওয়ার্কশপ অন পেস্টিসাইড রিস্ক রিডাকশন’ কর্মশালায় এই তথ্য উপস্থাপন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মহাপরিচালক মো. ছাইফুল আলম, আর সভাপতিত্ব করেন ডিএই এর সাবেক মহাপরিচালক আব্দুল মুঈদ। উপস্থিত ছিলেন কেবির এশিয়া অঞ্চলের ডেভেলপমেন্ট কমিউনিকেশন ম্যানেজার আজমত আব্বাস, বাংলাদেশ কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ ড. সালেহ আহমেদ ও প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর ড. দিলরুবা শারমিনসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্থেনিয়াম (Parthenium hysterophorus) নামক আগাছা বাংলাদেশে নতুন হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এই উদ্ভিদ, যা মাঠ, রাস্তার ধারে ও পতিত জমিতে অপ্রতিরোধ্যভাবে বিস্তার লাভ করছে। পাশাপাশি বিদেশি আগ্রাসী মাছগুলোও স্থানীয় প্রজাতির মাছের জন্য বড় বিপদ হয়ে উঠেছে। এরা প্রাকৃতিক মাছের উৎপাদন কমিয়ে দেয়া ছাড়াও কৃষিজমির উর্বরতাও ক্ষতিগ্রস্ত করছে, ফলে কৃষকদের জন্য বড় ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, পার্থেনিয়াম কৃষিজমির উর্বরতা কমিয়ে দেয় এবং ধান, গম, ভুট্টা, সবজি ও ডালশস্যের উৎপাদন হ্রাস করে। এর ফলে কৃষকরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। এছাড়া, এই আগাছা মাটির গুণাগুণ বদলে দেয়, যা স্থানীয় গাছপালা ও উদ্ভিদ প্রজাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক। মানুষের জন্যও এটি ক্ষতিকর, কারণ এর থেকে নির্গত রাসায়নিক উপাদান ত্বক, শ্বাসতন্ত্রে অ্যালার্জি, হাঁপানি, চোখে প্রদাহের মতো রোগ সৃষ্টি করে। পশুপালকরা যদি এই আগাছা খায়, তবে তাদের গবাদিপশুর দুধের মান কমে যায় এবং উৎপাদন ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দেয়।

অন্যদিকে, ১৯৮০-এর দশকে মাছ চাষের জন্য আফ্রিকান ক্যাটফিশ (Clarias gariepinus) বাংলাদেশে আনা হয়, যা স্থানীয় মাছের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। যদিও ২০১৪ সালে এর চাষ ও বিক্রি নিষিদ্ধ করা হলেও এখনও অবৈধভাবে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এটি দেশীয় ছোট মাছগুলোকে ব্যাপকভাবে দমন করছে এবং ভবিষ্যতে জিনগত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তেমনি পিরানহা বা সাকারমাউথ ক্যাটফিশ (Hypostomus plecostomus) হিসেবে পরিচিত এই মাছগুলোও দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। মূলত অ্যাকুয়ারিয়ামের মাছ হলেও এখন নদী-নালায় বিচরণ করছে। দূষিত জলও এদের বেঁচে থাকার জন্য উপযুক্ত, আর এই মাছগুলো দেশীয় মাছের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে এবং নদীর তলদেশে গর্ত করে নদীর উপকূল ও পরিবেশ নষ্ট করছে।

এছাড়া, বিদেশি কার্প মাছ যেমন বিগহেড, সিলভার, ও কমন কার্প প্রাকৃতিক জলাশয়ে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেছে। এই প্রজাতিগুলো দেশীয় মাছের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে টিকে থাকতে চায়, যা দেশের মাছের বৈচিত্র্য ও প্রজনন প্রক্রিয়াকে হুমকিতে ফেলেছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন, এসব বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতির প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে, বাংলাদেশের স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ চরম ঝুঁকিতে পড়বে। তাই এখনই প্রয়োজন উদ্ভিদ, মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর বৈধ প্রবেশের কঠোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণের।