০৪:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ২১ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষঃ
বার কাউন্সিলের নির্বাচন হবে ১৯ মে ইরান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৬ প্রবাসী বাংলাদেশি নিহত: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর জাননি ইরান সংঘাতে এখনও পর্যন্ত ৬ প্রবাসী বাংলাদেশি নিহত আ.লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর, শাস্তির বিধান যোগের প্রস্তুতি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত: বিশ্বজুড়ে খাদ্যদামের উত্থান অপতথ্য রোধে পুরোনো কাঠামোতে আমূল সংস্কার জরুরি: তথ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রথমবারের বৈঠক—গঠিত হচ্ছে ‘বেসরকারি খাত উপদেষ্টা পরিষদ’ জ্বালানি সংকটে অফিসঘণ্টা বদল, সন্ধ্যা ৬টার পর মার্কেট বন্ধের নির্দেশ ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জে অর্থনীতি: জ্বালানি, মূল্যস্ফীতি ও ডলারের চাপ জ্বালানি সঙ্কটে অফিস সময় বদল — সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা

মার্চে সর্বোচ্চ ধস, টানা আট মাস রপ্তানি আয় পতনে সতর্ক সংকেত

বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নবার্গিক মন্দা চলছে—মার্চ মাসে একাই রপ্তানি আয় আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১৮ শতাংশের বেশি কমে টানা অষ্টম মাসে নেতিবাচক ধারায় পৌঁছেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে দেখা যাচ্ছে, এটি চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের গত ৯ মাসে এক মাসে সর্বোচ্চ পতন হিসেবে রেকর্ড হয়েছে এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য বড় সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে।

ইপিবির হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মার্চে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৪৮ কোটি ডলার, যেখানে গত বছরের একই মাসে ছিল ৪২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ মাত্র এক মাসে রপ্তানি আয় কমেছে ৭৭ কোটি ডলার। সাধারণত প্রতি মাসে সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের রপ্তানির রোলাকাল প্রত্যাশিত থাকলেও মার্চে তা কেন্দ্রীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে, যার প্রভাব চলতি অর্থবছরের সামগ্রিক কারবারেও পড়েছে। জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ৩ হাজার ৫৩৯ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪.৮৫ শতাংশ কম।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রপ্তানি আয় হ্রাসের পেছনে অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক নানা কারণ কাজ করেছে। প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর আরোপিত ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক (অগাস্ট থেকে কার্যকর) মার্কিন বাজারে চাহিদা কমিয়েছে ও প্রতিযোগিতায় দেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় বাজারে চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের তীব্র মূল্যমুখী প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের অংশগুলোর অবস্থান দুর্বল করেছে। তাছাড়া মার্চে ঈদুল ফিতরের জন্য কারখানাগুলো গড়ে প্রায় ১০ দিন বন্ধ থাকায় উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রপ্তানি সরবরাহও সংকুচিত হয়েছে।

রপ্তানি খাতের সবচেয়ে বড় স্তম্ভ তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্প বিশেষভাবে আঘাত পেয়েছে। মার্চে পোশাক রপ্তানি একক পণ্য হিসেবে ১৯.৩৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে—গত বছরের মার্চে পোশাক রপ্তানি ছিল ৩৪৫ কোটি ডলার, যেখানে এবার তা নেমে এসেছে ২৭৮ কোটি ডলারে। বিজিএমইএর পরিচালক এবিএম শামসুদ্দিন বলেন, মার্কিন শুল্ক, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতার অনিশ্চয়তা—বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত—সব মিলিয়ে রপ্তানি খাতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। জ্বালানি ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং লজিস্টিক জটিলতাও দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

পোশাক খাতের পাশাপাশি অন্যান্য বড় খাত থেকেও ক্ষতি দেখা গেছে। ইপিবির তথ্যমতে গত ৯ মাসে হোম টেক্সটাইল রপ্তানি ২১ শতাংশ কমেছে এবং ওষুধ রপ্তানি ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ৭ শতাংশ কমেছে, পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি ১৩ শতাংশ কমেছে এবং সবজি রপ্তানিতে সবচেয়ে বড় ধস—প্রায় ৪৫ শতাংশ পতন ঘটেছে।

তবে সম্পূর্ণই অনুকূলে নয়; কিছু খাতে বৃদ্ধি দেখা গেছে। প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানি আয় বেড়েছে ১৬ শতাংশ, হিমায়িত মাছের রপ্তানি ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কাঁকড়া রপ্তানি ৩৩ শতাংশ বেড়ে রপ্তানি ধারায় কিছুটা স্বস্তি এনেছে।

বিশ্লেষকরা মত দেন, শীঘ্রই বৈশ্বিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে না এলে এবং বাজার বহুমুখীকরণ, উৎপাদনখাতে খরচ কমানো ও সরবরাহ শৃঙ্খল জট কমানোর মতো স্থির পদক্ষেপ না নিলে রপ্তানি খাতে এই মন্দা কাটানো কঠিন হবে। সরকারের প্রণোদনা, বাণিজ্য চুক্তি বৃদ্ধিমুখী কূটনীতি ও স্থানীয় উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণই দ্রুত উত্তরণে মূল চাবিকাঠি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ট্যাগ :
সর্বাধিক পঠিত

বার কাউন্সিলের নির্বাচন হবে ১৯ মে

মার্চে সর্বোচ্চ ধস, টানা আট মাস রপ্তানি আয় পতনে সতর্ক সংকেত

প্রকাশিতঃ ০২:২৪:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নবার্গিক মন্দা চলছে—মার্চ মাসে একাই রপ্তানি আয় আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১৮ শতাংশের বেশি কমে টানা অষ্টম মাসে নেতিবাচক ধারায় পৌঁছেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে দেখা যাচ্ছে, এটি চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের গত ৯ মাসে এক মাসে সর্বোচ্চ পতন হিসেবে রেকর্ড হয়েছে এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য বড় সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে।

ইপিবির হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মার্চে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৪৮ কোটি ডলার, যেখানে গত বছরের একই মাসে ছিল ৪২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ মাত্র এক মাসে রপ্তানি আয় কমেছে ৭৭ কোটি ডলার। সাধারণত প্রতি মাসে সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের রপ্তানির রোলাকাল প্রত্যাশিত থাকলেও মার্চে তা কেন্দ্রীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে, যার প্রভাব চলতি অর্থবছরের সামগ্রিক কারবারেও পড়েছে। জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ৩ হাজার ৫৩৯ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪.৮৫ শতাংশ কম।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রপ্তানি আয় হ্রাসের পেছনে অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক নানা কারণ কাজ করেছে। প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর আরোপিত ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক (অগাস্ট থেকে কার্যকর) মার্কিন বাজারে চাহিদা কমিয়েছে ও প্রতিযোগিতায় দেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় বাজারে চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের তীব্র মূল্যমুখী প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের অংশগুলোর অবস্থান দুর্বল করেছে। তাছাড়া মার্চে ঈদুল ফিতরের জন্য কারখানাগুলো গড়ে প্রায় ১০ দিন বন্ধ থাকায় উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রপ্তানি সরবরাহও সংকুচিত হয়েছে।

রপ্তানি খাতের সবচেয়ে বড় স্তম্ভ তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্প বিশেষভাবে আঘাত পেয়েছে। মার্চে পোশাক রপ্তানি একক পণ্য হিসেবে ১৯.৩৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে—গত বছরের মার্চে পোশাক রপ্তানি ছিল ৩৪৫ কোটি ডলার, যেখানে এবার তা নেমে এসেছে ২৭৮ কোটি ডলারে। বিজিএমইএর পরিচালক এবিএম শামসুদ্দিন বলেন, মার্কিন শুল্ক, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতার অনিশ্চয়তা—বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত—সব মিলিয়ে রপ্তানি খাতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। জ্বালানি ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং লজিস্টিক জটিলতাও দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

পোশাক খাতের পাশাপাশি অন্যান্য বড় খাত থেকেও ক্ষতি দেখা গেছে। ইপিবির তথ্যমতে গত ৯ মাসে হোম টেক্সটাইল রপ্তানি ২১ শতাংশ কমেছে এবং ওষুধ রপ্তানি ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ৭ শতাংশ কমেছে, পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি ১৩ শতাংশ কমেছে এবং সবজি রপ্তানিতে সবচেয়ে বড় ধস—প্রায় ৪৫ শতাংশ পতন ঘটেছে।

তবে সম্পূর্ণই অনুকূলে নয়; কিছু খাতে বৃদ্ধি দেখা গেছে। প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানি আয় বেড়েছে ১৬ শতাংশ, হিমায়িত মাছের রপ্তানি ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কাঁকড়া রপ্তানি ৩৩ শতাংশ বেড়ে রপ্তানি ধারায় কিছুটা স্বস্তি এনেছে।

বিশ্লেষকরা মত দেন, শীঘ্রই বৈশ্বিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে না এলে এবং বাজার বহুমুখীকরণ, উৎপাদনখাতে খরচ কমানো ও সরবরাহ শৃঙ্খল জট কমানোর মতো স্থির পদক্ষেপ না নিলে রপ্তানি খাতে এই মন্দা কাটানো কঠিন হবে। সরকারের প্রণোদনা, বাণিজ্য চুক্তি বৃদ্ধিমুখী কূটনীতি ও স্থানীয় উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণই দ্রুত উত্তরণে মূল চাবিকাঠি হিসেবে দেখা হচ্ছে।