বিশ্ব জাহাজ পুনর্ব্যবহার (শিপ রিসাইক্লিং) শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান এখনও শক্তিশালী। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডগুলো শুধু দেশে ইস্পাতের প্রধান কাঁচামাল যোগান দিচ্ছে না, বরং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্পায়নের গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করছে। ইউএনসিটিএডি ও অন্যান্য শিল্প প্রতিবেদন মতে বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে এই খাতে বিশ্বসেরা দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে থেকেছে।
শিল্পমহলের দাবিতে বর্তমানেও জাহাজ ভাঙা ও পুনর্ব্যবহার কার্যক্রম প্রতিবছর প্রায় ২.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করছে। দেশের নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতের জন্য প্রয়োজনীয় ইস্পাতের একটি বড় অংশই এই খাত থেকে আসে, ফলে নির্মাণখাতে খরচ সাশ্রয় এবং কাঁচামালের স্থানীয় যোগান নিশ্চিতে এ শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম।
তথ্য বলছে—২০২৪ সালে বাংলাদেশ প্রায় ২.৭৪ মিলিয়ন গ্রস টন জাহাজ পুনর্ব্যবহার করে, যা বৈশ্বিক বাজারের প্রায় ৪৩ শতাংশ। একই সময়ে বিশ্বব্যাপী ভাঙা বাল্ক ক্যারিয়ারের ৬৭ শতাংশ, গ্যাসবাহী জাহাজের ৫৮ শতাংশ এবং তেলবাহী ট্যাংকারের ৪২ শতাংশ বাংলাদেশে পুনর্ব্যবহার করা হয়েছে। তবে ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে ওঠানামা দেখা যায়; এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্ম (NSP) অনুযায়ী ২০২৫ সালে বাংলাদেশে মাত্র ৮৮টি স্ক্র্যাপ জাহাজ এসেছে (প্রায় ২.৬৮ মিলিয়ন টন), যা ২০২৪ সালের ১৩০টি জাহাজের তুলনায় প্রায় ৩২ শতাংশ কম। ওই বছর ভারত শীর্ষ অবস্থান নিয়ে আসে।
সীতাকুণ্ড উপকূল জুড়ে শতাধিক ইয়ার্ড গড়ে উঠেছে। প্রতিবছর বিশ্বের নানা জায়গা থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ জাহাজগুলো এখানে আনা হয়; ভাঙা জাহাজ থেকে পাওয়া ইস্পাত, যন্ত্রাংশ, পাইপ, কেবল ও অন্যান্য উপকরণ দেশে বিভিন্ন শিল্পে পুনর্ব্যবহার করা হয়। শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের মোট ইস্পাত কাঁচামালের প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত আসে জাহাজ পুনর্ব্যবহার খাত থেকে—যা নির্মাণ খাতের ব্যায় কমাতে বড় ভূমিকা রাখে।
কর্মসংস্থানেও জাহাজ ভাঙা শিল্পের অবদান বিশাল। প্রত্যক্ষভাবে প্রায় দুই লাখ শ্রমিক এই খাতে কাজ করেন; পরিবহন, অক্সিজেন সরবরাহ, যন্ত্রাংশ ব্যবসা, ইস্পাত রি-রোলিং মিলসহ সম্পর্কিত খাতে আরও প্রায় ১০ লাখ মানুষের জীবিকাও এর ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে আমদানি শুল্ক, কর ও বিভিন্ন ফি থেকে সরকারও উল্লেখযোগ্য রাজস্ব পায়।
আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ড মেনে ‘হংকং কনভেনশন’ কার্যকর হওয়ার পর বাংলাদেশ ধীরে ধীরে পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ জাহাজ পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশের ১৭টি ইয়ার্ড আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করে স্বীকৃতি পেয়েছে। সরকারও অননুমোদিত ও পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ ইয়ার্ডগুলোর বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সহায়ক হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। শ্রমিক নিরাপত্তা, পরিবেশ দূষণ, বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক মান অর্জন—এসবেই এখনও বড় উদ্বেগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এসব দিকগুলোতে উন্নতির প্রয়োজনাংশ তুলে ধরছে। এছাড়া ২০২৪–২০২৫ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, জাহাজ সরবরাহে উত্থানপতন ও নতুন নিয়ন্ত্রক বাধ্যবাধকতার কারণে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানিতে কিছু কমতি দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি বাংলাদেশ পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণ করে, আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলায় সক্ষমতা বাড়ায়, তাহলে আগামী দশকে জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্প আরও বড় আকারে জাতীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে পারবে। বিশ্বজুড়ে ভবিষ্যৎ কয়েক বছরে হাজার হাজার পুরোনো জাহাজ অবসরে যাবে—এই স্রোত বাংলাদেশকে নতুন সুযোগ করে দিতে পারে।
সংক্ষেপে বলা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে ওঠানামার মধ্যেও সঠিক নীতি, মানসম্পন্ন কার্যক্রম ও পরিবেশবান্ধব রূপান্তর নিশ্চিত করতে পারলে জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্প বাংলাদেশের জন্য অনাবিল সম্ভাবনার উৎস হয়ে উঠবে।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 























